বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ , বঙ্গবন্ধুর  আত্নস্বীকৃত খুনি এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নিরবতা  

সাজিয়া স্নিগ্ধা :: মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ঘৃণিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিলো ১৯৭৫ সালের  ১৫ আগস্ট। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত ঘাতক চক্র সেই কালরাত্রিতেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিজাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা করেছিলো।  

বাঙ্গালীর অধিকার আদায়ে ইতিহাসে শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে যতগুলো আন্দোলন হয়েছিলো তার প্রত্যেকটিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সামনের সারিতে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন৫৮ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন৬১ শিক্ষা নীতি আন্দোলন,৬৬ র ছয় দফা,৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান৭০ এর নির্বাচন৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং ভুমিকা ছিল সর্বাগ্রে। বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন হিসেব করলে  দেখা যায় জীবনের ১৩টি বছর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে  জেলখানায় কাটিয়েছেন তিনি শুধুমাত্র বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে। নিজের আরাম আয়েশসুখ সুবিধাপরিবার পরিজনভোগ বিলাসের কথা চিন্তা করেননি কখনও

ভাষা আন্দোলনের গোঁড়ার দিকে যদি যাই ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। পাকিস্তানের দুটি অংশ ছিল। পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের। দুটি অংশের  সাংস্কৃতিকভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেক মৌলিক পার্থক্য বিরাজমান ছিল।মিল ছিল কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এর পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে। বাঙ্গালীর জীবনে শোষণ নিপীড়ন বন্ধ হয়নি তখনও। কর্মক্ষেত্রে, অধিকারে,সন্মানে সকল দিক দিয়েও বাঙ্গালি পাকিস্তানীদের কাছে নির্যাতিত নিপীড়িত বঞ্চিত হতে থাকে ক্রমাগত। প্রথমে আঘাত আসে মাতৃভাষা বাংলার ওপর। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা বানাতে চেয়েছিল পাকিস্তান সরকার। এমন আকস্মিক এবং  অন্যায্য দাবি পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা  ভাষা ভাষীদের মধ্যে আন্দোলন  দানা বাঁধতে শুরু করেভাষা আন্দোলনের সময়ে বঙ্গবন্ধু জেলে অবস্থান করছিলেন। ভাষা আন্দোলনকে দিকনির্দেশনা প্রদান সহ  রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে  ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহম্মদ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি ৫২ আমরণ অনশন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর আত্নজীবনীতে লেখা আছে,  আমাদের এক জায়গায় রাখা হয়েছিল জেলের ভেতর। যে ওয়ার্ডে আমাদের রাখা হয়েছিলতার নাম চার নম্বর ওয়ার্ড। তিনতলা দালান। দেয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করতআর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট মেয়েরা একটুও ক্লান্ত হতো না। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’ ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’ নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, ‘হক সাহেব ওই দেখুনআমাদের বোনরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।’ হক সাহেব আমাকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছমুজিব।’ ( আত্মজীবনীশেখ মুজিবুর রহমানপৃষ্ঠা ৯৩) ১৯৫২ সালে গনআন্দোলন চূড়ান্ত আকার ধারন করলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

ভাষা আন্দোলনের পরেই বঙ্গবন্ধু শুরু করেন বাঙালির স্বাধীনতাস্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন।  ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৬৯ টি আসন হতে ১৬৭ টি আসনে জয়লাভ করে এবং ৩১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়যা আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার প্রদান করে।কিন্তু শুরু হয় ক্ষমতা প্রদানের টাল বাহানা।বছর পেরিয়ে যেতে থাকে। অপেক্ষায় ধর্যের বাঁধ যখন ভেঙ্গে যায় তখনই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে তিনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবী জানান। ১৯৭১ এর সেই ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালিকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামএবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রম।’ বঙ্গবন্ধুর এই ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে প্রস্তুত হয় বাঙালি। ২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।দেশের মুক্তিকামী মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের নির্যাতিত-নিপীড়িত পরাধীন বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়।মানচিত্রে নতুন জাতি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি অধিষ্ঠিত করে তাদের জাতির পিতার আসনে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ঠিকই কিন্তু পাকিস্তানের দালালরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হওয়ার চাইতে পাকিস্তানীদের গোলামী, চক্রান্ত আর চাতুকারিতাই পছন্দ করতো।তাইতো বঙ্গবন্ধু যখন ভগ্নপ্রায় বাংলাদেশ কে বিনির্মাণে আত্ননিয়োগ করেছিলেন তখন চক্রান্তকারীরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে কিভাবে ধ্বংস করা যায় তার পরিকল্পনা করছিলো।

নতুন আশা স্বপ্ন উদ্দিপনা নিয়ে স্বাধীনতার সুফল মানুষের ঘরে পৌঁছিয়ে দেবার জন্য দেশেরমানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে অগ্রসর হতে শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। গ্রহণ করেন দেশ পুনর্বাসন পুনর্গঠন কর্মসূচি। প্রথমেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি, জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন সেনাবাহিনীর , বিমানবাহিনী , নৌবাহিনী  পুনর্গঠন করেন। এর সাথে সাথে পাকিস্তানি দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাস্বচ্ছ নিরপেক্ষ ও উন্মুক্ত বিচারকার্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন-১৯৭৩মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন,ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্গঠনত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠনবাংলাদেশ হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠাবাংলাদেশ আইন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি;বাংলাদেশের জ্বালানী নিরাপত্তাপেট্রোল ও খনিজ সম্পদ উৎপাদনে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারি চুক্তি সম্পাদনরাষ্ট্রপতির ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল গঠনবাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ও সামুদ্রিক সম্পদরাজিট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (TCB), বাংলাদেশ কনজ্যুমার সাপ্লাইজ করপোরেশন অর্ডার১৯৭২ জারিদ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল কমিটি,জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ প্রেক্ষাপটচিকিৎসাশিক্ষাস্বাস্থ্যভৌত অবকাঠামো,প্রাতিষ্ঠানিক অবদানঃ বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র উদ্বোধনবাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের,চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন সহ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিভিন্ন বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে থাকেন।

বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন  এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কাজের পরিধি উল্লেখ করার পেছনে একটি কারন রয়েছে।  স্বাধীনতার পর এই সফলতা ও উন্নতির দিকে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার গতি বুঝতে পেরেই স্বাধীনতাবিরোধীচক্র দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র শুরু করে।

১৫ আগস্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে তাঁর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছাবঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, কনিষ্ঠ শেখ জামাল, শিশু পুত্র শেখ রাসেলদুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালবঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসেরভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত,আরিফ সেরনিয়াবাতদৌহিত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবুভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাতবঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিবঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল আহমেদ এবং ১৪ বছরের কিশোর আবদুল নঈম খান রিন্টুসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে ঘাতকরা হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা এবং কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি- ধর্মনিরপেক্ষতাবাঙালি জাতীয়তাবাদগণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত হয়েছিলোবঙ্গবন্ধুর গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলস্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধকে পদদলিত করে উল্টো পথে সেই পাকিস্তানি  ভাবধারার দিকে ধাবিত হয় বাংলাদেশ। ষড়যন্ত্রপাল্টা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একের পর এক সামরিক স্বৈরশাসনের পালা বদল হতে থাকে। সেই সঙ্গে সামরিক স্বৈরশাসকদের ছত্রছায়ায় দেশে স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত গোষ্ঠীউগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।মানবাধিকার রক্ষার জন্য হত্যাকারীদের বিচারের বিধান রয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে জাতির জনকের আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকেরেহাই দেবার জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটিঅর্ডিন্যান্স নামে এক কুখ্যাত কালো আইন সংবিধানে সংযুক্ত করে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয় বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে১৯৯৬সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতির কলঙ্কময় সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটিঅর্ডিন্যান্স জাতীয় সংসদ বাতিল করে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ব নেতৃবৃন্দ হতবাক হয়েছিল। যে বাংলাদেশের জন্য, বাঙ্গালির জন্য,  বাংলার মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু এত কিছু করেছেন তাকে কিভাবে বাঙ্গালীরা হত্যা করতে পারলো? ১৯৭১-এর হত্যাকাণ্ড মনে করিয়ে দেয় ২৩ জুন, ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে পাতানো যুদ্ধের পরাজয়ের পর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর চক্রের হাতে মুর্শিদাবাদে নির্মমভাবে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তাঁর পরিবারের বিয়োগান্তক ঘটনা।   

আজকে বাংলাদেশে কিছু হলে দেশীয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হয়ে যায়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, টেলিভিশনে বক্তব্য দিয়ে সেমিনার করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে যেদিন সপরিবারে হত্যা করেছিলো, দেশে স্বাধীনতার অমোঘ বানী জয় বাংলা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো, বঙ্গবন্ধুর আত্নস্বীকৃত খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিলো , মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কে ১৩ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো, আত্নগোপনে থাকা হত্যাকারীদের বিদেশ থেকে ফেরত চাওয়ার ব্যাপারে কখনই কোন কথা বলতে দেখিনি।এ সকল সময় মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিরব ভুমিকা সবসময়।  

মানুষের জন্মগত অধিকারই মানবাধিকার। বিশ্বের কোন দেশগোষ্ঠীদলজাতি ধর্ম ও বর্ণের মধ্যে মানবাধিকার সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিশ্ব ব্যাপী সকল জাগতিক সম্পর্কের সীমানা পেরিয়ে সকল মানুষের চিরন্তন অধিকার রক্ষায় আপোষহীন সংগ্রামই মানবাধিকার। জাতিসংঘ সনদ দ্বারা এই অধিকার স্বীকৃত।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এই ঘোষণা প্রদান করা হয়। প্রত্যেক মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এই সনদ ঘোষিত হয়।মানবাধিকার সংস্থগুলো এ সকল অধিকার নিয়েই কাজ করে।

মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রেরতেমনি মানবাধিকার সংরক্ষন করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।রাষ্ট্র যখন তা প্রদানে ব্যর্থ হয় তখন মানবাধিকার  লঙ্ঘিত হয়।তেমনি কোন সন্ত্রাসী যদি কাউকে হত্যা করে কিংবা  রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার খর্ব করে তখনও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। হত্যা কিংবা  ন্যায়বিচারে বাঁধা বিলম্বিত হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়।  মানবাধিকার সংরক্ষণে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের কিছু ধারা পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হল।  ধারা ১ এ উল্লেখ আছে,  সমস্ত মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাঁদের বিবেক এবং বুদ্ধি আছে সুতরাং সকলেরই একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে আচরণ করা উচিত্‍।ধারা ৩ এ উল্লেখ রয়েছে ,  জীবনস্বাধীনতা এবং দৈহিক নিরাপত্তায় প্রত্যেকের অধিকার আছে।ধারা ৫ এ আছে ,  কা‌উকে নির্যাতন করা যাবে নাকিংবা কারো প্রতি নিষ্ঠুরঅমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না অথবা কা‌উকে এহেন শাস্তি দেওয়া যাবে না।

উল্লেখিত ১ ধারা অনুযায়ী , বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন সে দেশে বঙ্গবন্ধুর অধিকার ছিল বাংলার মানুষ থেকে সন্মান মর্যাদা এবং অধিকার পাওয়ার । ধারা ৩  অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর ও   জীবনস্বাধীনতা এবং দৈহিক নিরাপত্তায় অধিকার ছিল। ধারা ৫ অনুযায়ী শুধু বঙ্গবন্ধু নয় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার প্রতি নিষ্ঠুরঅমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও তারা তাঁদের পিতা এবং পরিবারের হত্যাকাণ্ডের বিচার পায়নি।

কিছুদিন থেকেই লক্ষ্য করছি সাংবাদিক শহীদুল আলমকে নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সভা সেমিনার করছে কিন্তু শহিদুল আলম যে দিনের পর দিন বাংলাদেশের ইতিহাসকে বিকৃত করে যাচ্ছে, বাংলাদেশ নিয়ে একের পর এক মিথ্যাচার করে যাচ্ছে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে এটি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো কেন কথা বলছেন না ?একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অধিকার কে তাকে দিয়েছে? এটি শুধু আইনের চোখে না দেশের মানুষের চোখেও ঘৃণিত অপরাধ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেও দেখেছি দণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামীদের জন্য মানবিকতার বার্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী ঘুরে বেড়িয়েছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো।  

 

মুক্তিযুদ্ধে পাশবিক নির্যাতনের শিকার চার লাখ মা বোন,  শীর্ষ-বুদ্ধিজীবীদের পরিবার যেমন অপেক্ষা করছে রাজাকারদের বিচারের তেমনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও অপেক্ষা করছে তাঁর পরিবার এবং পিতৃ হত্যার বিচারের। বঙ্গবন্ধু হত্যার সাজাপ্রাপ্ত ৬ জন পলাতক খুনি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিমখন্দকার আবদুর রশিদআবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন এখন বিদেশে পালিয়ে আছে। শুধু অপরাধীদের জন্য সভা সেমিনার না করে   মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা খুনিদের ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সভা সেমিনার পিটিশন , আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে আবেদন  করতেন তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যার যে কলঙ্ক-তিলক  বাঙ্গালি মাথায় ধারণ করে আছে বাঙ্গালি তা নির্মূলে সহায়ক হবে। সাধারন মানুষেরও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে।  

 জানুয়ারী২০১৯